চরিত্র রচনার প্রতিভা
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ভাই শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন "বিদ্যাসাগর জীবনচরিত ও ভ্রমনিরাস"- এ লিখেছেন ১২২৭ সালের ১২ ই আশ্বিন মঙ্গলবার দ্বিপ্রহরের সময় জ্যেষ্ঠাগ্ৰজ ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় ভূমিষ্ঠ হন। রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন বাংলা সন তারিখ অনুযায়ী ২৫ শে বৈশাখ যেভাবে আমাদের মননে প্রোথিত হয়ে আছে, দুঃখের বিষয় বিদ্যাসাগরের জন্মদিনটি এখনো ইংরেজি সন তারিখ অনুযায়ী পালন করতে হয়। অথচ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ "বিদ্যাসাগরচরিত"- এ লিখেছেন, "বিদ্যাসাগর বাংলাভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী ছিলেন।" বাঙালি হিসাবে আমাদের উচিত ২৬ সেপ্টেম্বরের পরিবর্তে ১২ ই আশ্বিন তারিখটিকে চিহ্নিত করা ও সরকারীভাবে স্বীকৃতি দেওয়া। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, প্রতিভা মানুষের সমস্তটা নয়, তা মানুষের একাংশ মাত্র। প্রতিভা মেঘের মধ্যে বিদ্যুতের মত ; আর মনুষত্ব চরিত্রের দিবালোক, তা সর্বত্রব্যাপী ও স্থির। প্রতিভা মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ অংশ। কিন্তু চরিত্রের শ্রেষ্ঠতাই যে যথার্থ শ্রেষ্ঠতা, ভেবে দেখলে সে বিষয়ে কোন সংশয় থাকতে পারে না। যাদের মধ্যে মনুষ্যত্বের পরিমাণ অধিক, চিরাগত প্রথা ও অভ্যাসের জড় আচ্ছাদনে তাদের সেই প্রবল শক্তিকে চাপা দিয়ে রাখতে পারে না। বিদ্যাসাগরের জীবনে এর পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি আরো লিখেছেন, 'মাঝে মাঝে বিধাতার নিয়মের এরূপ আশ্চর্য ব্যতিক্রম হয় কেন, বিশ্বকর্মা যেখানে ৪ কোটি বাঙালি নির্মাণ করছিলেন সেখানে হঠাৎ দুই একজন মানুষ গড়ে বসেন কেন তা বলা কঠিন।' বিদ্যাসাগর তাঁর মায়ের কাছ থেকে শিখেছিলেন, মানুষের সেবাই যথার্থ দেবতার পূজা। বিদ্যাসাগরের হৃদয়বৃত্তির মধ্যে যে বলিষ্ঠতা দেখা যায় তাঁর বুদ্ধিবৃত্তির মধ্যেও তার পরিপূর্ণ প্রভাব প্রকাশ পায়। আমাদের এই অবমানিত দেশে ঈশ্বরচন্দ্রের মতো এমন অখণ্ড পৌরুষের আদর্শ কেমন করে জন্ম গ্রহণ করলো, আমরা বলতে পারি না। কাকের বাসায় কোকিলে ডিম পেড়ে যায়, মানব ইতিহাসের বিধাতা সেইরূপ গোপনে কৌশলে বঙ্গভূমির প্রতি বিদ্যাসাগরকে মানুষ করার ভার দিয়েছিলেন। বিদ্যাসাগরের চরিত্রের প্রধান গৌরব তাঁর অজেয় পৌরুষ,তাঁর অক্ষয় মনুষ্যত্ব। এটি আমরা যত অনুভব করব, ততই আমাদের শিক্ষা সম্পূর্ণ ও বিধাতার উদ্দেশ্য সফল হবে, এবং বিদ্যাসাগরের চরিত্র বাঙালির জাতীয় জীবনে চিরদিনের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকবে। আজ ১২ ই আশ্বিন বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জন্মদিনে তাঁকে শ্রদ্ধা ও প্রণাম নিবেদন করি।

