যৌন মিলন ছাড়াই ডিম পাড়ছে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির শকুনেরা
নিজস্ব প্রতিনিধিঃ অনেক দিন ধরেই বিজ্ঞানীদের মধ্যে কৌতূহল ছিল। কিন্তু এত দিন কিছুতেই তার উত্তর পাচ্ছিলেন না তাঁরা। অবশেষে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষার পরে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হলেন, যৌন মিলন ছাড়াই ডিম পাড়ছে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির শকুনেরা। আর সেই ডিম ফুটে সুস্থ ছানারাও জন্ম নিয়েছে। সেই ছানাদের শরীরে কিন্তু বাবার ডিএনএ বা জিন নেই। অর্থাৎ তারা যৌন মিলন ছাড়াই জন্মেছে। শকুন-ছানাদের শরীরে শুধু মায়ের জিনই পাওয়া গেছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার একটি বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ কেন্দ্রে বিলুপ্তপ্রায় শকুনেরা পুরুষ সঙ্গী ছাড়াই ডিম পাড়ছে এবং সন্তানের জন্মও দিচ্ছে। শকুন এমনিতেই বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির তালিকায় নাম লিখিয়ে ফেলেছে। ক্যালিফোর্নিয়ার ওই প্রজাতির মাত্র ২২টা শকুন বেঁচে ছিল। এখন তারা সংখ্যায় বেড়েছে। আর এই বৃদ্ধি হয়েছে অবিশ্বাস্যভাবেই।
সান দিয়েগো চিড়িয়াখানার প্রাণীবিদ ও গবেষক লিওনা চেমনিক বলছেন, পুরুষ সঙ্গী ছাড়াই অর্থাৎ যৌন মিলন না করেই সন্তানের জন্ম দেওয়ার এই পদ্ধতিকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘পার্থেনোজেনেসিস বা অপুংজনি’ বলে। মৌমাছি বা বিভিন্ন অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে এটা খুবই প্রচলিত। পুরুষ মৌমাছিরা এ ভাবেই জন্মায়। কয়েক প্রকার পিট ভাইপারের মধ্যেও এমন দেখা যায় মাঝেমধ্যে। কিন্তু শকুনদের মধ্যে এমন স্বভাব দেখে চমকেই গেছেন বিজ্ঞানীরা।
লিওনা বলছেন, মুরগি ও টার্কিদের মধ্যেও মাঝেমধ্যে পার্থেনোজেনেসিস দেখা যায়। তবে তা খুবই বিরল। দীর্ঘ সময় ধরে নিঃসঙ্গ থাকলে অযৌন জনন প্রক্রিয়ায় ডিম পাড়তে দেখা গেছে মুরগিকেও। তবে সেই ডিম ফুটে বেরনো ছানারা বেশিদিন বাঁচেনি। নর্থ ক্যারোলিনার একটি মেয়ে পিট ভাইপারকে পাঁচ বছর ধরে কোনও পুরুষ সঙ্গী ছাড়াই একা রেখেছিলেন বিজ্ঞানীরা। সেই পিট ভাইপারও চারটি ডিম পেড়েছিল। তার মধ্যে দুটি ডিম ফেটে ছানাও বের হয়। তাদের জিন পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছিল মায়ের সঙ্গে হুবহু মিল। পুরুষ সাপের জিনের অস্তিত্বই ছিল না তাতে।
ক্যারোলিনার বিরল প্রজাতির ওই শকুনদের মধ্যেও তেমনটাই দেখা গেছে। একটি মেয়ে শকুন সম্প্রতি দুটি ডিম পেড়েছে। দুটি ডিম ফুটেই পুরুষ ছানা জন্মেছে। তাদের জিন অবিকল মায়েরই মতো। বিজ্ঞানীদের দাবি, এই ঘটনা প্রমাণ দেয় যে, উপযুক্ত সঙ্গীর অভাবেই এই পদ্ধতির আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে মেয়ে শকুনেরা।
বিজ্ঞানী বলছেন, এই পার্থেনোজেনেসিস বা অযৌন জনন পদ্ধতি দু’রকমের হয়—১) হ্যাপ্লয়েড পার্থেনোজেনেসিস যাতে স্বাভাবিক মায়োসিস প্রক্রিয়ায় ডিম্বানু তৈরি হলেও তা নিষিক্ত না হয়ে সরাসরি ভ্রূণের জন্ম দেয়। ২) ডিপ্লয়েড পার্থেনোজেনেসিস যেখানে স্বাভাবিক মায়োসিস প্রক্রিয়াটাই হয় না। বরং মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় ডিম্বানু (2n) তৈরি হয়, পরে তা ভ্রূণে পরিণত হয়। উদ্ভিদ, অমেরুদণ্ডীপ্রাণীদের মধ্যে এই প্রক্রিয়াগুলো বেশি দেখা যায়।
ক্যালিফোর্নিয়ার বন্যপ্রাণ সংরক্ষণকেন্দ্রের কর্তৃপক্ষরা জানাচ্ছেন, ওই বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির শকুনদের সংখ্যা ১৯৮২ সালে ছিল ২২টি। ২০২২ সালে গিয়ে এদেরই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৬১। অথচ পুরুষ শকুনের সংখ্যা এতই কম ছিল যে বংশবৃদ্ধি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হওয়া সম্ভবই ছিল না। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মেয়ে শকুনরা অযৌন জনন পদ্ধদিতেই তাদের বংশরক্ষা করে গেছে। এখন এই শকুনদের সংখ্যা আরও বাড়ছে।

