শূন্যতা থেকে সংখ্যায় রূপান্তরের এক মহাজাগতিক ইতিহাস
বিশেষ প্রতিবেদন: গণিত শাস্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বিপ্লবী এবং জাদুকরী আবিষ্কার হলো ‘শূন্য’ (০)। আজ শূন্য ছাড়া আধুনিক বিজ্ঞান, মহাকাশ গবেষণা, কম্পিউটার প্রোগ্রামিং বা সাধারণ হিসাব-নিকাশের কথা কল্পনাই করা যায় না। কিন্তু এই শূন্য হুট করে একদিনে আকাশ থেকে পড়েনি। এর পেছনে রয়েছে হাজার বছরের বিবর্তন, দর্শন এবং ভারতীয় গণিতবিদদের কালজয়ী মেধা। শূন্যতা বা কিছু না থাকার ধারণাকে কীভাবে একটি শক্তিশালী সংখ্যায় রূপান্তর করা হলো, তা মানব সভ্যতার এক রোমাঞ্চকর অধ্যায়।
শূন্যের আদি ইতিহাস
শূন্যের ইতিহাসের প্রথম ধাপটি ছিল কোনো সংখ্যার মাঝে খালি জায়গা বা ‘স্থান’ বোঝানো। আজ থেকে প্রায় ৪,০০০ বছর আগে প্রাচীন ব্যাবিলনীয়রা সংখ্যার মাঝে ফাঁকা জায়গা বোঝাতে এক ধরণের যমজ বাঁকা দাগ ব্যবহার করত। যেমন— ২০৫ লিখতে ২০ এবং ৫ এর মাঝে শূন্যের মতো একটি প্রতীক বসানো হতো, যাতে কেউ ভুল করে এটিকে ২৫ না পড়ে। একইভাবে প্রাচীন মায়ান সভ্যতার মানুষ এবং মিশরীয়রাও হিসাবের সুবিধার্থে এক ধরণের স্থানবাচক চিহ্নের ব্যবহার শুরু করেছিল। তবে তারা কেউই শূন্যকে আলাদা একটি স্বাধীন সংখ্যা বা গাণিতিক সত্তা হিসেবে গণ্য করেনি। সেটি ছিল কেবলই একটি প্রতীক।
ভারতীয় দর্শন ও শূন্যের প্রকৃত জন্ম
শূন্যের প্রকৃত আবিষ্কার এবং একে পূর্ণাঙ্গ সংখ্যার মর্যাদা দেওয়ার কৃতিত্ব প্রাচীন ভারতের। ভারতীয় সংস্কৃতিতে সনাতন এবং বৌদ্ধ দর্শনে ‘শূন্যতা’ বা ‘মহাশূন্য’ নিয়ে গভীর আধ্যাত্মিক চর্চা ছিল। আধ্যাত্মিক জগতের এই ‘কিছু না থাকা’র অবস্থাকে গণিতে রূপ দেন ভারতীয় পণ্ডিতরা। খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকে (প্রায় ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে) মহান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতবিদ আর্যভট্ট তাঁর ‘আর্যভটীয়’ গ্রন্থে প্রথম স্থানবাচক মান (Place Value) ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন। তিনি দশভিত্তিক সংখ্যা গণনার পদ্ধতি তৈরি করেন, যেখানে শূন্যের ধারণাটি পরোক্ষভাবে উপস্থিত ছিল। তিনি শূন্য বোঝাতে ‘খ’ বা ‘আকাশ’ শব্দটি ব্যবহার করতেন।
আর্যভট্টের ধারণাকে পূর্ণতা দেন সপ্তম শতকের (৬২৮ খ্রিস্টাব্দ) বিখ্যাত গণিতবিদ ব্রহ্মগুপ্ত। তাঁকে শূন্যের প্রকৃত প্রবক্তা বলা চলে। তিনিই প্রথম তাঁর ‘ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত’ গ্রন্থে শূন্যকে কেবল একটি স্থানবাচক প্রতীক হিসেবে নয়, বরং একটি স্বাধীন সংখ্যা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। শুধু তাই নয়, শূন্য দিয়ে কীভাবে যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ করতে হবে, তার সুনির্দিষ্ট নিয়মাবলী বা সূত্র বেঁধে দেন তিনি। যেমন:কোনো সংখ্যার সঙ্গে শূন্য যোগ বা বিয়োগ করলে সেই সংখ্যার কোনো পরিবর্তন হয় না।কোনো সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে গুণ করলে তার ফল শূন্য হয়।
যদিও শূন্য দিয়ে কোনো সংখ্যাকে ভাগ করার ক্ষেত্রে তাঁর ধারণায় কিছুটা ত্রুটি ছিল (যা পরবর্তীকালে দ্বাদশ শতাব্দীতে ভাস্করাচার্য সংশোধন করে ‘অনন্ত’ বা Infinity আবিষ্কার করেন), তবুও ব্রহ্মগুপ্তের হাত ধরেই শূন্য গাণিতিক রূপ লাভ করে। গোয়ালিয়রের একটি চতুর্ভুজ মন্দিরের দেওয়ালে খোদাই করা ৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের একটি লিপিতে আজও প্রাচীনতম লিখিত শূন্যের (০) খোঁজ পাওয়া যায়।
ভারত থেকে বিশ্বজয়:
ভারতের এই আবিষ্কার নবম শতাব্দীতে বাগদাদের ‘হাউস অব উইজডম’-এ পৌঁছায়। বিখ্যাত আরব গণিতবিদ আল-খোয়ারিজমি ভারতীয় এই সংখ্যাতত্ত্বের ওপর গভীর গবেষণা করেন। তিনি সংস্কৃতির ‘শূন্য’ শব্দটিকে আরবি অনুবাদ করে নাম দেন ‘সিফর’ (Sifr), যার অর্থ খালি। এই ‘সিফর’ শব্দটিই পরবর্তীতে ইউরোপে গিয়ে ‘জিরো’ (Zero)-তে রূপান্তরিত হয়। আরবের হাত ধরেই দ্বাদশ শতকে ইতালীয় গণিতবিদ ফিবোনাচ্চির মাধ্যমে এই শূন্যের ধারণা ইউরোপে প্রবেশ করে এবং রোমান সংখ্যার জটিলতা দূর করে আধুনিক গণিতের ভিত্তি স্থাপন করে।আজকের ডিজিটাল দুনিয়ার মূল ভিত্তি বাইনারি কোড (০ এবং ১)। এই আধুনিক প্রযুক্তির আদি উৎস লুকিয়ে আছে ভারতের সেই প্রাচীন শূন্যের আবিষ্কারের মধ্যেই। শূন্যতা থেকে শুরু হয়ে আজ বিশ্বকে সচল রাখার এক অন্যতম চালিকাশক্তি এই ‘০’।

