বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
হট টপিক

রোজ হাঁটলেই চাঙ্গা থাকবে মস্তিষ্ক, জানাচ্ছে আধুনিক গবেষণা

প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
রোজ হাঁটলেই চাঙ্গা থাকবে মস্তিষ্ক, জানাচ্ছে আধুনিক গবেষণা
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

বিশেষ প্রতিবেদন: ইট-কাঠ-পাথরের খাঁচায় বন্দি নাগরিক জীবন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একটানা ইঁদুরদৌড়, ফাইলের পাহাড়, আর ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে কেটে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এই রোজনামচার হাত ধরেই আমাদের শরীরে এসে বাসা বাঁধে একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় অভিশাপ— স্ট্রেস বা মানসিক টানাপোড়েন। এই মানসিক ক্লান্তি শুধু যে আমাদের মেজাজ খিটখিটে করে দেয় তা নয়, নিঃশব্দে ক্ষতি করে শরীরের সবচেয়ে জটিল অঙ্গটিরও। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, তা হলো আমাদের মস্তিষ্ক। কিন্তু এই জটিল সমস্যার সমাধান লুকিয়ে রয়েছে এক্কেবারে সহজ এক অভ্যাসের মধ্যে। চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং হালের নানাবিধ বৈজ্ঞানিক গবেষণা বারবার একটি সহজ সত্যকে সামনে আনছে— রোজ নিয়ম করে হাঁটাহাঁটি করা হলো সবচেয়ে মোক্ষম ও প্রাকৃতিক ‘স্ট্রেস বাস্টার’ বা মানসিক চাপ মুক্তির চাবিকাঠি।

সম্প্রতি স্নায়ুবিজ্ঞান বা নিউরোসায়েন্সের এক যুগান্তকারী গবেষণায় এই তথ্যের সপক্ষে এক অকাট্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মিলেছে। গবেষণাটি করা হয়েছিল মূলত ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ মানুষদের নিয়ে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা এবং বিভিন্ন অংশের পারস্পরিক যোগাযোগ স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা শিথিল হতে শুরু করে। প্রবীণদের ওপর এই হাঁটার অভ্যাস ঠিক কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা হাতেনাতে দেখতে গবেষকেরা এক অভিনব পরীক্ষা চালান। তাঁরা সমবয়সী একদল ষাটোর্ধ্ব মানুষকে বেছে নিয়ে তাঁদের সমান দু’টি শ্রেণিতে বা গ্রুপে ভাগ করে দেন।
গবেষণার শুরুতে দুই গ্রুপের মানুষের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার একটি প্রাথমিক খতিয়ান নেওয়া হয়। এর পর প্রথম গ্রুপের মানুষদের নির্দেশ দেওয়া হয়, তাঁরা যেন টানা এক বছর ধরে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে নিয়ম করে হাঁটাহাঁটি করেন। অন্য দিকে, দ্বিতীয় গ্রুপের মানুষদের বলা হয়, তাঁরাও এক বছর ধরে শরীরচর্চা করবেন, তবে তা কোনও কঠোর পরিশ্রমের কাজ নয়, বরং একেবারেই হালকা কিছু ফ্রি-হ্যান্ড ব্যায়াম বা স্ট্রেচিং।
গবেষণার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটি ছিল এর প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন। এক বছরের এই দীর্ঘ সফর শুরু করার ঠিক আগে, দুই গ্রুপের প্রত্যেকটি মানুষেরই একটি বিশেষ পরীক্ষা করা হয়েছিল। চিকিৎসা পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘ফাংশনাল এমআরআই’ (Functional MRI) বা এফএমআরআই (fMRI)। এই বিশেষ স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে মানব মস্তিষ্কের ভেতরে রক্তচলাচলের গতিপ্রকৃতি এবং বিভিন্ন অংশের সক্রিয়তা নিখুঁতভাবে মাপা যায়। সাধারণ এমআরআই-এর তুলনায় এটি অনেক বেশি উন্নত, কারণ এটি মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করছে তার একটি জীবন্ত ছবি তুলে ধরে।
এক বছর ধরে দুই গ্রুপের মানুষই তাঁদের নিজেদের দেওয়া নির্দিষ্ট রুটিন কঠোরভাবে মেনে চলেন। প্রথম দল প্রতিদিন ঘাম ঝরিয়ে হেঁটেছেন, আর দ্বিতীয় দল করেছেন হালকা ব্যায়াম। ঠিক ৩৬৫ দিন পর, অর্থাৎ এক বছর সময়সীমা পার হওয়ার পর, গবেষকেরা পুনরায় ওই দুই গ্রুপের মানুষদের ল্যাবরেটরিতে ডেকে পাঠান। তাঁদের মস্তিষ্কের অবস্থা ঠিক কী পর্যায়ে রয়েছে তা খতিয়ে দেখতে আবারও করা হয় একই রকম ফাংশনাল এমআরআই (fMRI)।
দ্বিতীয়বারের এই এমআরআই রিপোর্টের ফলাফল যখন চিকিৎসকদের হাতে আসে, তখন তা দেখে কার্যত তাজ্জব বনে যান গবেষকেরা। দুই গ্রুপের রিপোর্টের মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক ধরা পড়ে। দেখা যায়, যে প্রবীণরা এক বছর ধরে প্রতিদিন নিয়ম করে হাঁটাহাঁটি করেছিলেন, তাঁদের মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ গঠনে এক অভূতপূর্ব ও ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। মানুষের মস্তিষ্কের চিন্তাভাবনা, স্মৃতিশক্তি এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মূলত তিনটি প্রধান অংশ কাজ করে— ফ্রন্টাল লোব (Frontal lobe), টেম্পোরাল লোব (Temporal lobe) এবং প্যারাইটাল লোব (Parietal lobe)।
স্ক্যান রিপোর্টে দেখা যায়, যাঁরা রোজ হেঁটেছেন, তাঁদের মস্তিষ্কের এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ লোব বা অংশের মধ্যকার পারস্পরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বা স্নায়বিক সংযোগ আগের চেয়ে অনেক বেশি পোক্ত ও মজবুত হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই সংযোগের ঘনত্ব এবং সক্রিয়তাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্য দিকে, যাঁরা কেবল হালকা ব্যায়াম করেছিলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের এই সংযোগের মানচিত্রে তেমন কোনও রদবদল লক্ষ্য করা যায়নি।
চিকিৎসকদের মতে, মানব মস্তিষ্কের এই তিনটি লোব আমাদের দৈনন্দিন জীবনে চালকের ভূমিকা পালন করে:
•    ফ্রন্টাল লোব: কপাল বা কপালের ঠিক পেছনের এই অংশটি আমাদের মনোযোগ ধরে রাখতে, বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে, যে কোনও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।
•    টেম্পোরাল লোব: কানের ঠিক ওপরের দিকের এই অংশটি মূলত আমাদের স্মৃতিশক্তি ধরে রাখার আধার। নতুন কিছু শেখা, পুরনো কথা মনে করা এবং ভাষা বোঝার কাজ নিয়ন্ত্রণ করে এটি।
•    প্যারাইটাল লোব: মাথার ওপরের ও পেছনের দিকের এই অংশটি আমাদের চারপাশের পরিবেশের স্পর্শ, স্বাদ, এবং স্থানিক অবস্থান বুঝতে সাহায্য করে।
রোজকার হাঁটাহাঁটি কীভাবে এই তিনটি অংশের যোগাযোগ বাড়িয়ে দিল, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, হাঁটার সময় ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা বাড়ে। এর ফলে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের জোগান এবং রক্ত সঞ্চালন বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এই বাড়তি অক্সিজেন ও পুষ্টি উপাদান মস্তিষ্কের ঝিমিয়ে পড়া স্নায়ুকোষ বা নিউরনগুলিকে নতুন জীবন দান করে। ফলে তাদের মধ্যকার তথ্য আদান-প্রদানের পথটি অনেক বেশি মসৃণ ও দ্রুত গতির হয়ে ওঠে।
এই গবেষণার ফলাফল চিকিৎসাক্ষেত্রে, বিশেষ করে প্রবীণদের চিকিৎসায় এক নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের মধ্যেই ভুলে যাওয়ার রোগ বা ‘ডিমেনশিয়া’ (Dementia) এবং স্মৃতিভ্ৰংশের মারাত্মক রূপ ‘আলঝেইমার্স’ (Alzheimer's disease) দেখা দেয়। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, যদি মাঝবয়স থেকেই প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলা যায়, তবে বার্ধক্যে এসে এই সমস্ত জটিল স্নায়বিক রোগের ঝুঁকি প্রায় অর্ধেক কমিয়ে আনা সম্ভব। কারণ, নিয়মিত হাঁটার ফলে মস্তিষ্কের যে অংশগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় থাকে, সেগুলি আগে থেকেই অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
এর পাশাপাশি, বর্তমান সময়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও অবসাদ ও চরম উদ্বেগের (Anxiety) সমস্যা গ্রাফের মতো বাড়ছে। কর্মক্ষেত্রের তুমুল চাপ কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই নানারকমের ঘুমের ওষুধ বা অবসাদরোধী বড়ি খাওয়া শুরু করেন। চিকিৎসকেরা কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলছেন, কৃত্রিম উপায়ে স্ট্রেস কমানোর এই চেষ্টা হিতে বিপরীত হতে পারে। তার চেয়ে প্রতিদিন ভোরের আলোয় কিংবা বিকেলের পড়ন্ত রোদে পার্কের সবুজ ঘাসে বা ফাঁকা রাস্তায় একটু জোরে জোরে হাঁটার অভ্যাস অনেক বেশি কার্যকরী ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন।
হাঁটার অভ্যাস তৈরি করতে কোনও দামি জিম মেম্বারশিপ বা আধুনিক সরঞ্জামের প্রয়োজন পড়ে না। প্রয়োজন শুধু একটুখানি সদিচ্ছা এবং সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, একবারে অনেকটা না হেঁটে সহজ কিছু নিয়ম মেনে হাঁটা শুরু করা উচিত:
1.    ধীরে শুরু করে গতি বাড়ানো: প্রথম দিনই খুব জোরে বা অনেকটা পথ হাঁটার প্রয়োজন নেই। শুরুতে ১৫-২০ মিনিট সাধারণ গতিতে হাঁটুন। শরীর মানিয়ে নিলে ধীরে ধীরে সময় ও গতি বাড়ান।
2.    সঠিক জুতো নির্বাচন: হাঁটার সময় পায়ের পাতার ওপর পুরো শরীরের ভর থাকে। তাই হাঁটার জন্য আরামদায়ক ও নরম সোলের জুতো ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে পায়ে বা হাঁটুতে কোনও চোট না লাগে।
3.    সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন: সুস্থ থাকতে সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি গতিতে হাঁটার পরামর্শ দিচ্ছেন হৃদরোগ ও স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞরা। অর্থাৎ, প্রতিদিন আধ ঘণ্টা করে সপ্তাহে পাঁচ দিন হাঁটলেই কেল্লাফতে।
স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমরা অনেকেই ভাবি শরীরচর্চা মানেই বোধহয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিমে গিয়ে ভারী ওজন তোলা। কিন্তু আমাদের শরীর ও মস্তিষ্ককে সচল রাখতে প্রকৃতির সবচেয়ে বড় উপহার হলো সহজ এই হাঁটার প্রক্রিয়া। এই গবেষণা প্রমাণ করে দিল যে, স্রেফ হেঁটে কেতাবি কায়দায় জিম না করেও আমরা আমাদের মনকে শান্ত আর মগজকে ধারালো রাখতে পারি।
তাই আর দেরি কেন? প্রতিদিনের ব্যস্ত শিডিউল থেকে মাত্র ৩০টি মিনিট নিজের জন্য বের করে নিন। আজ থেকেই পায়ে গলিয়ে নিন একজোড়া ভালো জুতো আর বেরিয়ে পড়ুন রাস্তায়। মনে রাখবেন, আপনার প্রতিদিনের এই কয়েক হাজার পদক্ষেপ কেবল আপনার ওজন কমাবে না বা হার্ট ভালো রাখবে না, বরং আপনার মস্তিষ্কের প্রতিটি কোণকে করে তুলবে অনেক বেশি সজীব, সক্রিয় আর চাপমুক্ত। সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনের মূল মন্ত্র তাই লুকিয়ে রয়েছে আপনার নিজের পায়ের পায়েই!