রায়বাড়ির আলোর রোশনাই: শিশুসাহিত্যিক পুণ্যলতা চক্রবর্তীর জীবনগাথা
বিশেষ প্রতিবেদনঃ বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসে যে কয়েকটি পরিবার শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চায় চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে, তাদের মধ্যে অন্যতম কলকাতার বিখ্যাত ‘রায়চৌধুরী পরিবার’ বা ‘রায়বাড়ি’। এই পরিবারের প্রতিটি সদস্যই ছিলেন স্বমহিমায় উজ্জ্বল। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী থেকে শুরু করে সুকুমার রায়, সুবিনয় রায় এবং পরবর্তী প্রজন্মে সত্যজিৎ রায়— এই নামগুলি বাংলা সাহিত্যের এক একটি স্তম্ভ। কিন্তু এই পুরুষপ্রধান তালিকার পাশাপাশি রায়বাড়ির কন্যারাও যে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছিলেন, সেই ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবময়। আজ ১০ সেপ্টেম্বর, বাংলা শিশুসাহিত্যের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র পুণ্যলতা চক্রবর্তীর জন্মদিন। ১৮৯০ সালের এই দিনে তিনি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। নিজের সহজাত প্রতিভা এবং সহজ-সরল লেখার শৈলী দিয়ে তিনি বাঙালি শিশুদের মনের মণিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছিলেন।
পুণ্যলতা চক্রবর্তীর আদি পৈতৃক নিবাস ছিল বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহ বা কিশোরগঞ্জের মসুয়া গ্রামে। তবে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা তৎকালীন কলকাতার এক মুক্তমনা, প্রগতিশীল এবং সংস্কৃতিচর্চায় মুখরিত পারিবারিক পরিবেশে। তাঁর পিতা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছিলেন একাধারে বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক, প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ, চিত্রশিল্পী এবং আধুনিক মুদ্রণ শিল্পের পথিকৃৎ। মা বিধুমুখী দেবী ছিলেন বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক ও ব্রাহ্মসমাজের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের কন্যা। ফলে পুণ্যলতা দেবী মাতুলালয় এবং পিত্রালয়— দুই তরফ থেকেই পেয়েছিলেন এক অনন্য প্রগতিশীল মানসিকতা।
পরিবারের ভাইবোনদের মধ্যে পুণ্যলতা ছিলেন উপেন্দ্রকিশোরের দ্বিতীয় কন্যা এবং তৃতীয় সন্তান। তাঁর বড় ভাই ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অবিসংবাদিত ‘ননসেন্স’ ও শিশুসাহিত্যের রাজা সুকুমার রায়। অন্য দুই ভাই হলেন সুবিনয় রায় ও সুবিমল রায়, যাঁরা দুজনেই সাহিত্য এবং সংগীত সাধনায় যুক্ত ছিলেন। তাঁর বড় দিদি সুখলতা রাও-ও ছিলেন বাংলা শিশুসাহিত্যের এক অত্যন্ত জনপ্রিয় লেখিকা। এইরকম এক পারিবারিক আবহে যেখানে সারাদিন সাহিত্যচর্চা, ছবি আঁকা, গানের রেওয়াজ এবং নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক মুদ্রণ যন্ত্র নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলত, সেখানে পুণ্যলতার মনের বিকাশ খুব স্বাভাবিকভাবেই ঘটেছিল।
সেকালের সমাজব্যবস্থায় মেয়েদের পড়াশোনার পথ খুব একটা মসৃণ ছিল না। তবে প্রগতিশীল ব্রাহ্ম পরিবারের সন্তান হওয়ার কারণে পুণ্যলতা দেবী সেই বাধা সহজেই অতিক্রম করতে পেরেছিলেন। তিনি কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে বিএ (BA) পাস করেন। কলেজে পড়ার সময়েই, ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়। তাঁর স্বামী অরুণনাথ চক্রবর্তী ছিলেন একজন শিক্ষিত ও মার্জিত রুচির মানুষ, যিনি পেশায় ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। বিয়ের পর পুণ্যলতা দেবীর কর্মক্ষেত্র ও বাসস্থান কলকাতার বাইরে বিভিন্ন জেলায় স্থানান্তরিত হলেও, তাঁর ভেতরের সাহিত্যিক মনটি কখনো হারিয়ে যায়নি। বরং স্বামীর উৎসাহে তিনি তাঁর লেখালিখির চর্চা অবিরত রেখেছিলেন।
পুণ্যলতা চক্রবর্তীর সাহিত্যিক জীবনের এক বড় অংশ জুড়ে ছিল তাঁদের পারিবারিক পত্রিকা ‘সন্দেশ’। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী যখন ১৯১৩ সালে ছোটদের জন্য এই জাদুকরী পত্রিকাটির প্রকাশনা শুরু করেন, তখন থেকেই রায়বাড়ির ছেলেমেয়েরা সেখানে নিয়মিত লিখতে শুরু করেন। পুণ্যলতা দেবীও ‘সন্দেশ’ পত্রিকার একজন নিয়মিত লেখিকা ছিলেন। তিনি মূলত ছোটদের জন্য সহজ ভাষায় বিজ্ঞান, পশুপাখি এবং গাছপালার কথা লিখতেন। জটিল বৈজ্ঞানিক তথ্যকে কীভাবে গল্পের ছলে ছোটদের সামনে পরিবেশন করা যায়, সেই শিল্প তিনি খুব ভালো জানতেন। তাঁর ‘গাছপালার কথা’ কলামটি সেই সময়ে ছোটদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল।
পুণ্যলতা চক্রবর্তীর জীবনের এবং বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা অমর সৃষ্টি হলো তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘ছেলেবেলার দিনগুলি’। এটি কেবল একটি আত্মস্মৃতি নয়, বরং উনিশ শতকের শেষের দিকে এবং বিশ শতকের শুরুর দিকের কলকাতার এক অনন্য সামাজিক দলিল। এই বইটিতে তিনি অত্যন্ত মধুর এবং সহজ ভাষায় তাঁর শৈশবের রায়বাড়ির দিনগুলির কথা তুলে ধরেছেন।
বইটির পাতা ওল্টালেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক যৌথ পরিবারের অনাবিল আনন্দ, ভাইবোনদের খুনসুটি এবং বাবা উপেন্দ্রকিশোরের স্নেহময় ছায়া। বড়দা সুকুমার রায়ের ছোটবেলার নানা মজার কাণ্ডকারখানা, সুকুমার রায়ের অদ্ভুত সব কল্পনাপ্রবণ চিন্তাভাবনা এবং ভাইবোনদের নাটক করার গল্প তিনি এমনভাবে লিখেছেন, যা পাঠককে অনায়াসে সেই সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। বইটির ভাষা এতই সরল এবং ঝরঝরে যে, তা ছোট-বড় সব বয়সের পাঠককেই সমানভাবে আকর্ষণ করে। কোনো রকম অহংকার বা গাম্ভীর্য ছাড়াই তিনি এক বিখ্যাত পরিবারের অন্দরমহলকে সাধারণ মানুষের ড্রয়িংরুমে এনে হাজির করেছেন।
‘ছেলেবেলার দিনগুলি’ ছাড়াও পুণ্যলতা চক্রবর্তী ছোটদের জন্য বহু মৌলিক গল্প, উপন্যাস এবং অনুবাদ সাহিত্য রচনা করেছিলেন [১.১.৫, ১.৩.৮]। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলির মধ্যে রয়েছে, ছোট্ট ছোট্ট গল্প। এটি শিশুদের জন্য লেখা নীতিশিক্ষা ও আনন্দের ছোট ছোট কাহিনীর সংকলন। এছাড়া সাদিব ম্যাজিক, গাছপালার কথা, রাজবাড়ি উল্লেখযোগ্য।
দেশ-বিদেশের বহু ক্ল্যাসিক গল্পকে তিনি অত্যন্ত চমৎকারভাবে বাংলা অনুবাদ করেছিলেন, যাতে বাঙালি শিশুরা বিশ্বসাহিত্যের আস্বাদ নিজেদের মাতৃভাষায় পেতে পারে। তাঁর লেখার মূল বৈশিষ্ট্যই ছিল— কোনো উপদেশ না দিয়ে, অত্যন্ত ভালোবাসার সঙ্গে শিশুদের মনের জগতকে ছুঁয়ে যাওয়া।
পুণ্যলতা চক্রবর্তীর ব্যক্তিগত জীবনও ছিল অত্যন্ত সফল। তাঁর দুই কন্যা ছিলেন অত্যন্ত কৃতি এবং সমাজের উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর জ্যেষ্ঠা কন্যা কল্যাণী কারলেকার ছিলেন একজন বিশিষ্ট সমাজসেবী, ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপিকা এবং লেখিকা। আর তাঁর কনিষ্ঠা কন্যা নলিনী দাশ ছিলেন বাংলা শিক্ষা জগতের এক উজ্জ্বল নাম। নলিনী দাশ ছিলেন বেথুন কলেজের অধ্যক্ষা, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং একজন দারুণ শিশুসাহিত্যিক। মায়ের ধারা বজায় রেখে নলিনী দাশও ছোটদের জন্য ‘লুসি রায়ের গোয়েন্দা কাহিনী’ লিখে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। এছাড়া পুণ্যলতা দেবীর ভাতুষ্পুত্র অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত মধুর। রায়বাড়ির এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তিনি পরম যত্নে তাঁর সন্তানদের মধ্যেও সঞ্চারিত করতে পেরেছিলেন।
১৯৭৪ সালের ২১ নভেম্বর ৮৪ বছর বয়সে কলকাতায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহিয়সী লেখিকা। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বাংলা শিশুসাহিত্যের একটি স্বর্ণালী অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন শিশুরা ক্রমশ বইয়ের পাতা ছেড়ে মোবাইল আর অনলাইনের দুনিয়ায় মগ্ন হয়ে পড়ছে, তখন পুণ্যলতা চক্রবর্তীর মতো লেখিকাদের সৃষ্টি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তাঁর লেখা গল্পগুলি শিশুদের মনের কল্পনাশক্তিকে বাড়িয়ে তোলে, তাদের প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে যায় এবং এক সুস্থ পারিবারিক মূল্যবোধ শেখায়। রায়বাড়ির আলোর রোশনাইকে তিনি নিজের মেধা দিয়ে যেভাবে আরও উজ্জ্বল করেছিলেন, তার জন্য বাঙালি পাঠক সমাজ তাঁর কাছে চিরকাল ঋণী থাকবে। আজ জন্মদিনে স্বতন্ত্র খবর তাঁকে আন্তরিক শ্রদ্ধা নিবেদন করছে।

