বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
অবকাশ

শতবর্ষ পেরিয়েও অমলিন ‘সুরসাগর’ জগন্ময় মিত্রের সুর-সাধনা

প্রকাশিত: ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
শতবর্ষ পেরিয়েও অমলিন ‘সুরসাগর’ জগন্ময় মিত্রের সুর-সাধনা
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

বিশেষ প্রতিবেদন: ১৯৩৮ সালের এক রৌদ্রোজ্জ্বল দুপুর। অল বেঙ্গল মিউজিক অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গীত প্রতিযোগিতার আসর বসেছে কলকাতায়। ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুংরি আর টপ্পার একের পর এক কঠিন তানে মঞ্চ কাঁপাচ্ছেন তাবড় সঙ্গীতশিল্পীরা। তারই মাঝে মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন কুড়ি বছরের এক তরুণ। গৌরবর্ণ, চোখে গভীর স্বপ্ন আর কণ্ঠে এক অদ্ভুত জাদুকরী মাদকতা। তিনি গাইতে শুরু করতেই আসরে নেমে এল পিনপতন নীরবতা। রাগ-রাগিনীর সূক্ষ্ম কাজ আর অনন্য গায়কি দিয়ে সেদিন বিচারক থেকে শুরু করে আপামর শ্রোতাকুলকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিলেন তিনি। সেই প্রতিযোগিতায় ধ্রুপদ ও টপ্পায় শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা ছিনিয়ে নিয়েছিলেন সেই তরুণ। তিনি আর কেউ নন, বাংলা ও হিন্দি আধুনিক গানের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শক, ‘সুরসাগর’ জগন্ময় মিত্র। স্বতন্ত্র খবর তাঁকে বিনম্র প্রণাম জানাচ্ছে। 

আজ, ৬ সেপ্টেম্বর, এই কিংবদন্তি শিল্পীর শুভ জন্মদিন। সময়ের নিয়মে তিনি আজ আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া গানের অমূল্য সম্ভার আজও বাঙালি তথা আপামর ভারতবাসীর মনে সমানভাবে দোলা দেয়। বাংলা আধুনিক গানকে যারা এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর মধ্যে জগন্ময় মিত্রের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। প্রণয় ও বিরহের এমন মেলবন্ধন খুব কম শিল্পীর কণ্ঠেই ধরা পড়েছে। আজ তাঁর জন্মতিথিতে ফেলে আসা সেই সোনালী যুগের স্মৃতি রোমন্থন করছে সঙ্গীতজগৎ।
১৯১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে জন্ম নেন জগন্ময় মিত্র। তবে তাঁর জন্মের দুই মাস আগেই তাঁর পিতার আকস্মিক মৃত্যু হয়। ফলে মাতুলালয় এবং দাদুর স্নেহে চেতলার বাড়িতেই বড় হয়ে ওঠেন তিনি। জমিদার পরিবারের রক্ষণশীলতার কারণে প্রথমে তাঁর পেশাদার সঙ্গীতশিল্পী হওয়া নিয়ে পরিবারে যথেষ্ট আপত্তি ছিল। কিন্তু রক্তের টানেই যেন সঙ্গীতের প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল জন্মগত। তাঁর ঠাকুরদাদা বিধুভূষণ মিত্র এবং কাকা পঞ্চানন মিত্র ছিলেন অত্যন্ত সঙ্গীতানুরাগী। বিশেষ করে তাঁর কাকা চমৎকার হারমোনিয়াম বাজাতেন এবং ওস্তাদদের কাছে নিয়মিত রাগ-রাগিনীর তালিম নিতেন। কাকার সেই রেয়াজ ঘরের বাইরে বসে তন্ময় হয়ে শুনতেন ছোট্ট জগন্ময়। মাত্র ১০-১১ বছর বয়সে তিনি প্রথম শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দীক্ষা নেন কেশব মুখোপাধ্যায়ের কাছে। ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুংরি ও টপ্পার সেই শক্ত ভিতই পরবর্তীকালে তাঁর আধুনিক গানে এক অদ্ভুত গভীরতা এনে দিয়েছিল।
এর পর তাঁর সঙ্গীত জীবনের মোড় ঘোরে পণ্ডিচেরীর দিলীপকুমার রায়ের সংস্পর্শে এসে। দিলীপকুমার রায় এই তরুণ প্রতিভাকে চিনে নিতে ভুল করেননি। তাঁরই সুযোগ্য তত্ত্বাবধানে জগন্ময় নিজের গায়কিকে আরও মার্জিত করে তোলেন। ১৯৩৮ সালে সর্বভারতীয় সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় সেরা খেয়াল গায়কের সম্মান পাওয়ার পর আর তাঁকে পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
কলকাতায় এইচএমভি (HMV)-র রিহার্সেল রুমে একদিন কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয় তরুণ জগন্ময় মিত্রের। নজরুলের সেই তেজস্বী ব্যক্তিত্ব এবং সান্নিধ্য তাঁকে গভীরভাবে শিহরিত ও অনুপ্রাণিত করেছিল। ১৯৩৯ সালে মুক্তি পায় তাঁর প্রথম গানের রেকর্ড। চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি যখন রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করেন, তখন তা ঘরে ঘরে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ‘তুমি কি কেবলই ছবি’, ‘আসনখনি পাতব কোথায়’—তাঁর কণ্ঠে এই গানগুলি এক নতুন মাত্রা পেয়েছিল।
তবে জগন্ময় মিত্রের প্রতিভা শুধু বাংলার গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে কিছু আদর্শগত মতপার্থক্যের কারণে তিনি কলকাতা ছেড়ে বোম্বে (বর্তমান মুম্বই) চলে যান। আর সেখানেই জন্ম নেয় এক নতুন ইতিহাস। বোম্বেতে তিনি ‘জগমোহন’ নামে আত্মপ্রকাশ করেন। হিন্দি অ-ফিল্মি গান বা ‘গীত’ (Geet)-কে জনপ্রিয় করার পেছনে তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। এই কারণেই তাঁকে হিন্দি গীতের জনক (Father of the Hindi Geet) বলা হয়।
কিংবদন্তি সুরকার কামাল দাশগুপ্তের সুরে তাঁর গাওয়া ‘ও বর্ষা কে পহেলে বাদল’ (Meghdoot, 1945) গানটি গোটা দেশে ঝড় তুলেছিল। এছাড়া ‘মুঝে না সপ্নো সে বহলাও’, ‘দিল কো হ্যায় তুমসে পেয়ার কিউঁ’, ‘ইক বার মুসকরা দো’—গানগুলি আজও সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে পরম সম্পদ। হিন্দি গানের জগতে তাঁর নরম, মায়াবী এবং মন ছুঁয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বর সেই সময়ের চড়া সুরের বলিউড গানের ভিড়ে এক অদ্ভুত শান্তি এনে দিত।
জগন্ময় মিত্র কেবল একজন অসাধারণ গায়কই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত উঁচুদরের সুরকার। বোম্বেতে থিতু হওয়ার পর ১৯৫৫ সালে ‘সর্দার’ চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব পান তিনি। এই ছবিতে তাঁরই সুরেলা কম্পোজিশনে সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকর গেয়েছিলেন কালজয়ী গান ‘পেয়ার কি ইয়ে তলখিয়াঁ’। গানটি মুক্তি পাওয়া মাত্রই আকাশছোঁয়া সাফল্য পায়। লতা মঙ্গেশকর স্বয়ং জগন্ময়ের সুরের কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। এই ছবির সাফল্যের পর তাঁর কাছে বহু হিন্দি ছবির সুর করার প্রস্তাব আসতে থাকে। মুম্বইয়ের পাশাপাশি গুজরাতেও তাঁর ভজন ও গীত দারুণ সমাদৃত হয়েছিল।
সঙ্গীতজগতে তাঁর এই অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ (Padma Shri)-তে ভূষিত করে। তাঁর অনুজ প্রতিম প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় একবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “জগন্ময় মিত্র এক অসাধারণ এবং বিরল সঙ্গীতপ্রতিভা, যাঁর সঠিক মূল্যায়ন হয়তো সব সময় করা হয়নি”। কিন্তু প্রকৃত সঙ্গীতপ্রেমীদের হৃদয়ে তিনি সবসময়ই এক বিশেষ আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
২০০৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর, ৮৫ বছর পূর্ণ হওয়ার ঠিক দু’দিন আগে মুম্বইয়ের জুহুর বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহান শিল্পী। কিন্তু শারীরিক মৃত্যু ঘটলেও তাঁর গান আজও অমর। ‘সারেগামা’ মিউজিক কোম্পানি তাঁর স্মৃতিতে ‘দ্য বেস্ট অফ সুরসাগর জগমোহন’ নামে একটি বিশেষ অ্যালবাম প্রকাশ করেছে, যেখানে তাঁর কালজয়ী গানগুলো স্থান পেয়েছে।
আজ তাঁর জন্মদিনে নস্টালজিক হয়ে পড়েছেন বহু প্রবীণ ও নবীন সঙ্গীতশিল্পী। বর্তমানের দ্রুতলয়ের গানের যুগেও জগন্ময় মিত্রের গলার সেই মন্দ্রিত সোদামাটি ও প্রেমের টান আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—গান আসলে কেবল বিনোদন নয়, গান হল এক অন্তহীন সাধনা। ‘সুরসাগর’-এর সেই সুরের সাগরে আজ আরও একবার ডুব দেওয়ার দিন।

আরও অবকাশ খবর