বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
অবকাশ

কল্পতরুর খোঁজে: পুষ্টি, অর্থনীতি ও সংকটের আবহে বিশ্ব নারিকেল দিবস

প্রকাশিত: ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
কল্পতরুর খোঁজে: পুষ্টি, অর্থনীতি ও সংকটের আবহে বিশ্ব নারিকেল দিবস
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

নিজস্ব প্রতিবেদন: আজ, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ক্যালেন্ডারের পাতায় আজকের দিনটি চিহ্নিত ‘বিশ্ব নারিকেল দিবস’ (World Coconut Day) হিসেবে। ফল হিসেবে আপেল বা আম যতটাই জনপ্রিয় হোক না কেন, মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে নারিকেলের মতো বহুমুখী অবদান খুব কম ফলেরই আছে। গাছের পাতা থেকে শুরু করে কাণ্ড, জটা থেকে শুরু করে ভেতরের সুমিষ্ট জল ও শাঁস— এই ফলের কোনো অংশই ফেলনা নয়। আর সেই কারণেই পুরাণ ও লোকগাথায় একে ‘কল্পতরু’ বা ‘জীবনবৃক্ষ’ (Tree of Life) বলে সম্মান দেওয়া হয়েছে।

২০০৯ সাল থেকে প্রতি বছর ২ সেপ্টেম্বর এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় নারিকেল সম্প্রদায়ের (APCC) উদ্যোগে বিশ্বজুড়ে এই দিবস পালিত হয়ে আসছে। ২০২৬ সালের এই বিশেষ দিনে আন্তর্জাতিক স্তরে মূল স্লোগান বা থিম নির্ধারণ করা হয়েছে— “অনিশ্চয়তার সময়ে নারিকেল: খাদ্য, জ্বালানি এবং জীবিকার নিরাপত্তা” (“Coconuts in Times of Uncertainty: Securing Food, Energy, and Livelihoods”)। একদিকে বিশ্ব উষ্ণায়ন ও আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা, অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও অর্থনৈতিক সংকট— এই জোড়া ফলায় দাঁড়িয়ে নারিকেল কীভাবে মানবসভ্যতাকে রক্ষা করতে পারে, তা নিয়েই আজ রাজ্য তথা দেশজুড়ে চলছে কাটাছেঁড়া।
বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে নারিকেলের যোগ সুপ্রাচীন। বিজয়া দশমীর ‘নারকেলের নাড়ু’ হোক বা পৌষ সংক্রান্তির পিঠেপুলি— এই ফল ছাড়া বাঙালির উৎসবের আমেজ ভাবাই যায় না। শুধু মিষ্টিই নয়, চিংড়ির মালাইকারি থেকে শুরু করে নিরামিষ ছোলার ডাল কিংবা কচু শাকের স্বাদ বাড়াতেও নারিকেল অপরিহার্য।
তবে কেবল স্বাদে নয়, পুষ্টিগুণেও এটি অনন্য। চিকিৎসকদের মতে, কচি ডাবের জল হলো প্রকৃতির সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম ও খনিজ উপাদান, যা শরীরকে নিমেষে সতেজ করে এবং ডিহাইড্রেশনের সমস্যা দূর করে। অন্যদিকে, নারিকেলের শাঁসে থাকে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, ফাইবার এবং ভিটামিন বি-৬, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে ভার্জিন কোকোনাট অয়েলের ব্যবহার ইদানীং বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতিতে, বিশেষত উপকূলবর্তী রাজ্যগুলিতে নারিকেল চাষ এক বিরাট স্তম্ভ। ২০২৬ সালের সাম্প্রতিকতম পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নারিকেল উৎপাদনে ভারত আজ বিশ্বমঞ্চে প্রথম সারিতে উঠে এসেছে। ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপিন্সকে টপকে বিশ্ব উৎপাদনের প্রায় ৩১.২৪ শতাংশ একাই জোগান দিচ্ছে ভারত। দেশের প্রায় ২.১৯ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে এই চাষ হচ্ছে এবং বার্ষিক উৎপাদন ছাড়িয়েছে ২০.৩ বিলিয়ন বা ২ হাজার কোটির গণ্ডি।
ভারতের দক্ষিণ প্রান্তের রাজ্যগুলি যেমন কেরালা, তামিলনাড়ু এবং কর্ণাটক এই উৎপাদনের মূল কারিগর। তবে ইদানীং পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা এবং অসমের মতো রাজ্যগুলিতেও নারিকেল চাষের পরিধি বাড়ছে। কেন্দ্রীয় নারিকেল উন্নয়ন বোর্ড (Coconut Development Board) বর্তমানে কৃষকদের শুধু নারিকেল বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে মূল্যযুক্ত পণ্য (Value-added products) যেমন— নারকেলের চিপস, গুঁড়ো দুধ, প্যাকেটজাত ডাবের জল এবং হরেক রকমের হস্তশিল্প তৈরির প্রশিক্ষণ ও আর্থিক অনুদান দিচ্ছে।
উৎপাদনের এই চোখধাঁধানো খতিয়ানের আড়ালে কিন্তু রয়েছে এক গভীর দুশ্চিন্তার চোরাস্রোত। পশ্চিমবঙ্গের নারিকেল চাষিরা ইদানীং এক অদ্ভুত সংকটের মুখোমুখি। মরসুম ছাড়াই কলকাতার বাজারে একটা ভালো ডাব কিনতে এখন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ টাকা খসাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। একদিকে জোগান কম, অন্যদিকে চাহিদার পারদ তুঙ্গে।
কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা এর জন্য দায়ী। মোবাইল টাওয়ারের লাগাতার রেডিয়েশন নারিকেল গাছের পরাগায়নে (Pollination) বাধা সৃষ্টি করছে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন। এর ফলে গাছের ফল ধারণের ক্ষমতা কমছে। শুধু তাই নয়, নারিকেলের আকারও উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট হয়ে যাচ্ছে এবং ভেতরে জলের পরিমাণ কমছে। অনেক ক্ষেত্রে পোকার আক্রমণে ফল পাকার আগেই কালো হয়ে ঝরে পড়ছে।
আজ বিশ্ব নারিকেল দিবস উপলক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার মোহনপুরে অবস্থিত বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (BCKV) এক বিশেষ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় নারিকেল উন্নয়ন বোর্ডের কলকাতা শাখার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে বিজ্ঞানীরা আধুনিক উপায়ে নারিকেল চাষ এবং এই নতুন সংকটগুলি থেকে গাছকে বাঁচানোর বৈজ্ঞানিক উপায় নিয়ে চাষিদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন।
জাতীয় স্তরেও এই দিনটিতে কৃষকদের স্বার্থে নতুন প্রযুক্তির উন্মোচন করা হয়েছে। কেরালার কাসারাগড়ের ‘সেন্ট্রাল প্ল্যান্টেশন ক্রপস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ (ICAR-CPCRI) আজ লঞ্চ করেছে ‘SHITIZ 2.0’ নামে একটি অনলাইন মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম। এর মূল উদ্দেশ্য হলো গ্রামীণ তরুণ ও স্টার্ট-আপগুলিকে নারিকেল ভিত্তিক বিভিন্ন কুটির শিল্প ও ব্যবসার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া।
পরিবেশবিদদের মতে, নারিকেল গাছ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে উপকূলবর্তী এলাকায় সামুদ্রিক ঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসের দাপট কমাতে এই গাছের কোনো বিকল্প নেই। শিকড়ের মজবুত বাঁধন মাটির ক্ষয় রোধ করে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের এই কঠিন সময়ে দাঁড়িয়ে বেশি করে নারিকেল গাছ লাগানো কেবল অর্থনৈতিক কারণে নয়, পরিবেশের স্বার্থেও বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
আজকের এই বিশেষ দিনে নারিকেল চাষকে আরও বিজ্ঞানসম্মত করে তোলার অঙ্গীকার নিতে হবে। প্রযুক্তিগত কারণে যদি গাছের ক্ষতি হয়, তবে তার বিকল্প খুঁজতে হবে বিজ্ঞানীদেরই। নারিকেল গাছের পরিচর্যা এবং চাষিদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে পারলে তবেই ‘জীবনবৃক্ষ’ তার নামের সার্থকতা বজায় রাখতে পারবে এবং আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করবে।

আরও অবকাশ খবর