ইতিহাসের বুকে আজও জীবন্ত শ্রীরামপুর
কল্যাণী ঘোষাল
গঙ্গার শান্ত জলধারার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন শহর—শ্রীরামপুর। ইতিহাস, ধর্ম, শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিলনক্ষেত্র এই জনপদ। কলকাতা থেকে মাত্র কুড়ি কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই শহর বহু শতাব্দীর স্মৃতি বয়ে চলেছে আজও।
একসময় এই অঞ্চল ছিল ডেনমার্কের অধীনে। ডেনীয় শাসকেরা শহরটির নাম দিয়েছিলেন “ফ্রেডরিকনগর”। শ্রীপুর, আকনা, গোপীনাথপুর, মোহনপুর ও পেয়ারাপুর—এই পাঁচটি জনপদকে একত্র করে গড়ে উঠেছিল সেই ফ্রেডরিকনগর। শেওড়াফুলির রাজাদের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে ডেনীয়রা এখানে বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করেছিল।
তবে সময়ের স্রোতে “ফ্রেডরিকনগর” নাম হারিয়ে যায়। ১৭৫২ সালে শেওড়াফুলির রাজা মনোহর রায় শ্রীরামচন্দ্রের মন্দির নির্মাণ করলে সেই দেবতার নাম থেকেই জায়গাটির নাম হয় “শ্রীরামপুর”।
---
শিক্ষার আলোয় আলোকিত এক শহর
অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে শ্রীরামপুর হয়ে ওঠে বাংলার নবজাগরণের অন্যতম কেন্দ্র। ১৭৯৯ সালে মার্শম্যান ও ওয়ার্ড খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এখানে আসেন। পরে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন বিখ্যাত মিশনারি উইলিয়াম কেরি।
এই তিনজনের উদ্যোগে বাংলা ভাষা, মুদ্রণশিল্প, প্রকাশনা ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার নতুন যুগের সূচনা হয়। তাঁদের হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রীরামপুর কলেজ। ১৮২১ সালে ডেনমার্কের রাজকীয় সনদে এই কলেজ প্রতিষ্ঠা পায়।
আজও শ্রীরামপুর কলেজ বাংলার শিক্ষা-ইতিহাসে এক গৌরবময় নাম।
---
গঙ্গার ধারে ইউরোপীয় স্মৃতিচিহ্ন
গঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা বহু পুরনো অট্টালিকা আজও ডেনীয়দের স্মৃতি বহন করে। ১৮০৫ সালে নির্মিত সেন্ট ওলাফের গির্জা শ্রীরামপুরের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা।
রেলস্টেশনের কাছেই রয়েছে ডেনীয় কবরখানা। সেখানে সমাধিস্থ আছেন উইলিয়াম কেরি, মার্শম্যান ও ওয়ার্ড। অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকের বহু ইউরোপীয় ব্যক্তির সমাধি আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়েছে সেখানে।
---
গোস্বামী পরিবারের ঐশ্বর্য ও অবদান
শ্রীরামপুরের উন্নয়নের ইতিহাসে গোস্বামী পরিবারের অবদান অনস্বীকার্য। বর্ধমানের পাটুলি থেকে এসে রামগোবিন্দ গোস্বামী এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন।
তাঁর বংশধরেরা ডেনীয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিপুল সম্পত্তির মালিক হন। রঘুরাম গোস্বামী এতটাই প্রভাবশালী ছিলেন যে, ডেনীয়রা যখন শ্রীরামপুর ইংরেজদের কাছে বিক্রি করতে চায়, তখন তিনিও বারো লক্ষ টাকায় শহরটি কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দেন।
আজও শহরের বহু রাজপ্রাসাদতুল্য বাড়ি তাঁদের স্মৃতি বহন করে।
---
রাধাবল্লভ মন্দিরের অলৌকিক কাহিনি
শ্রীরামপুরের বল্লভপুর অঞ্চলে অবস্থিত রাধাবল্লভ মন্দির ঘিরে রয়েছে এক বিস্ময়কর কিংবদন্তি।
কথিত আছে, সাধক রুদ্ররাম পণ্ডিত স্বপ্নাদেশ পান যে গৌড়ের সুলতানের প্রাসাদের এক পাথরের স্তম্ভ থেকে কৃষ্ণমূর্তি নির্মাণ করতে হবে। সেই পাথর নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার পর অলৌকিকভাবে তা বল্লভপুরে এসে পৌঁছায়।
সেই পাথর থেকেই তৈরি হয় তিনটি কৃষ্ণমূর্তি—রাধাবল্লভ, শ্যামসুন্দর ও নন্দদুলাল। ১৬৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রাধাবল্লভ মন্দির।
এই মন্দিরকে একসময় “হেনরি মার্টিনের প্যাগোডা” নামেও ডাকা হত।
---
ওয়ালশ হাসপাতাল ও মদনমোহনের স্মৃতি
অষ্টাদশ শতকে দক্ষিণী বৈষ্ণবেরা এখানে মদনমোহনের মন্দির স্থাপন করেছিলেন। পরে সেই স্থানেই ১৮৩৬ সালে গড়ে ওঠে ওয়ালশ হাসপাতাল।
মদনমোহনের বিগ্রহ অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে গিয়ে নতুন আটচালা মন্দির নির্মাণ করা হয়। ডেনীয় সরকার দীর্ঘদিন এই মন্দিরের সেবার জন্য অর্থসাহায্য দিত।
---
চৈতন্যদেবের পদচিহ্নে চাতরা
শ্রীরামপুরের উত্তরে অবস্থিত চাতরা অঞ্চল বৈষ্ণব ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখানকার গৌরাঙ্গ মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শ্রীচৈতন্যের পার্ষদ কাশীশ্বর পণ্ডিত। কথিত আছে, পুরী যাওয়ার পথে মহাপ্রভু স্বয়ং এই মন্দিরে এসেছিলেন।
নিজের মূর্তি দেখে তিনি অসন্তুষ্ট হয়ে সেই বিগ্রহ গঙ্গায় বিসর্জনের নির্দেশ দেন। পরে তাঁর দেহত্যাগের পর পুনরায় সেই মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
আজও এই মন্দির ভক্তি ও ইতিহাসের এক অপূর্ব নিদর্শন।
---
গঙ্গার তীরে আজও প্রাণবন্ত শ্রীরামপুর
ডেনীয় উপনিবেশ, বাংলার নবজাগরণ, ধর্মীয় ঐতিহ্য, জমিদারি সংস্কৃতি ও শিক্ষা আন্দোলনের অসংখ্য স্মৃতি নিয়ে শ্রীরামপুর আজও ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে এক আকর্ষণের শহর।
গঙ্গার বাতাসে, পুরনো গির্জার ঘণ্টাধ্বনিতে, রাজবাড়ির বারান্দায় আর মন্দিরের আরতিতে আজও যেন শোনা যায় অতীতের পদধ্বনি।

