প্রাচীন ভারতের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী মহর্ষি কণাদ ‘অণু’-বাদ-এর জনক
নিজস্ব প্রতিনিধিঃ প্রাচীন ভারত শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক সাধনা বা সাহিত্যের দেশ ছিল না, বিজ্ঞান ও দর্শনের ক্ষেত্রে এই ভূমির অবদান ছিল অতুলনীয়। আধুনিক বিজ্ঞান আজ থেকে মাত্র কয়েকশো বছর আগে যে পরমাণু বা অণুর তত্ত্ব আবিষ্কার করেছে, তার হাজার হাজার বছর আগেই এক ভারতীয় ঋষি সেই সত্য বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছিলেন। তিনি হলেন মহর্ষি কণাদ। তিনি ছিলেন প্রাচীন ভারতের এক মহান দার্শনিক, বিজ্ঞানী এবং বৈশেষিক দর্শনসূত্রের প্রণেতা।
মহর্ষি কণাদের আসল নাম ছিল ‘কশ্যপ’। কিন্তু তাঁর ‘কণাদ’ নাম হওয়ার পিছনে একটি অত্যন্ত সুন্দর এবং অর্থবহ ইতিহাস রয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, জগতের প্রতিটি বস্তুই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা দিয়ে তৈরি। তিনি রাস্তায় বা খেত-খামারে পড়ে থাকা শস্যের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা বা খুঁদ কুড়িয়ে জীবনধারণ করতেন এবং সেই কণা নিয়েই দিনরাত গবেষণা করতেন। শস্যের ‘কণা’ আহার বা ভক্ষণ করতেন বলেই সমকালীন মানুষ ও শিষ্যেরা ভালোবেসে তাঁর নাম দিয়েছিলেন ‘কণাদ’ (কণ + অদ্, যার অর্থ কণা ভক্ষণকারী)।
আধুনিক বিজ্ঞান ডাল্টনকে পরমাণুবাদের জনক বলে মনে করে। কিন্তু ডাল্টনের প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে মহর্ষি কণাদ পরমাণুর ধারণা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এই মহাবিশ্বের প্রতিটি দৃশ্যমান বস্তুকে যদি ভাঙা হতে থাকে, তবে শেষ পর্যন্ত এমন একটি ক্ষুদ্রতম অংশ পাওয়া যাবে, যাকে আর কোনোভাবেই ভাঙা বা বিভাজন করা সম্ভব নয়। এই অবিভাজ্য ক্ষুদ্রতম অংশের নামই তিনি দিয়েছিলেন ‘পরমাণু’। আজকের আধুনিক বিজ্ঞান যাকে ‘Atom’ বলে, মহর্ষি কণাদের ‘পরমাণু’ ছিল ঠিক তাই।
মহর্ষি কণাদ কেবল পরমাণুর নাম দিয়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি এর বৈশিষ্ট্যও ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর মতে:
• পরমাণু খালি চোখে দেখা যায় না, এটি অতি ক্ষুদ্র এবং অদৃশ্য।
• পরমাণু নিত্য, অর্থাৎ এর কোনো ধ্বংস বা সৃষ্টি নেই।
• দুটি পরমাণু একসঙ্গে যুক্ত হয়ে ‘দ্ব্যণুক’ (Diatomic molecule) তৈরি করে। তিনটি দ্ব্যণুক মিলে তৈরি হয় ‘ত্রসরেণু’।
• তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, আলো বা তাপের সংস্পর্শে এলে পরমাণুর মধ্যে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে।
আজকের রসায়ন শাস্ত্রে (Chemistry) আমরা যা পড়ি, তার মূল ভিত্তি লুকিয়ে রয়েছে মহর্ষি কণাদের এই সূত্রে।
মহর্ষি কণাদের লেখা বিখ্যাত গ্রন্থের নাম ‘বৈশেষিক সূত্র’। এই গ্রন্থে তিনি জড় জগৎ বা পদার্থের শ্রেণিবিন্যাস করেছেন। তিনি সমগ্র সৃষ্টিকে নয়টি দ্রব্যে ভাগ করেছিলেন— ক্ষিতি (মাটি), অপ (জল), তেজ (আগুন), মরুৎ (বাতাস), ব্যোম (আকাশ), কাল (সময়), দিক (স্থান), আত্মা এবং মন। তাঁর এই চিন্তা প্রমাণ করে যে, তিনি আধ্যাত্মিকতার চেয়ে যুক্তিবাদ এবং বস্তুবাদের ওপর বেশি জোর দিয়েছিলেন। মহাকর্ষ বা পৃথিবীর টান নিয়েও তাঁর সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি লিখেছিলেন, উপর থেকে কোনো বস্তু নিচে পড়ে কারণ পৃথিবীর একটি বিশেষ আকর্ষণ বল রয়েছে।
মহর্ষি কণাদ ছিলেন প্রাচীন ভারতের এমন এক মণীষী, যিনি বিজ্ঞানকে ধর্মের গোঁড়ামি থেকে মুক্ত করে যুক্তি ও প্রমাণের আলোয় এনেছিলেন। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, সঠিক প্রচার এবং ইতিহাসের অবহেলার কারণে বিশ্বমঞ্চে বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতি পাননি। তবে বর্তমান যুগের বিজ্ঞানপ্রেমী ও গবেষকেরা তাঁর আবিষ্কারের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারছেন। সনাতন ভারতীয় আদর্শের মূর্ত বিগ্রহ মহর্ষি কণাদের উদ্দেশ্যে আমাদের এই বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন এক নগন্য প্রয়াস মাত্র।

