ভগবানের হাতের বীণা
কাজী নজরুল ইসলামকে "আনন্দময়ীর আগমনে" কবিতাটি প্রকাশের জন্য বৃটিশ সরকার রাজদ্রোহের অভিযোগে ১৯২২ সালে গ্ৰেপ্তার করে। এই প্রসঙ্গে তাঁর জবানবন্দী ছিল অসাধারণ। সেখান থেকেই স্বল্প পরিসরে তুলে ধরলে কবির প্রকৃত সত্তাকে বোঝা যায়। তিনি বলছেন - আমি কবি, আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করবার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তি দানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। কবির কণ্ঠে ভগবান সাড়া দেন। আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা, ভগবানের বাণী। সে বাণী রাজ বিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারে সে বাণী ন্যায়দ্রোহী নয় সত্যদ্রোহী নয়। সে বাণী রাজদ্বারে দণ্ডিত হতে পারে, কিন্তু ধর্মের আলোকে, ন্যায়ের দুয়ারে তা নিরপরাধ, নিষ্কলুষ, অম্লান, অনির্বাণ,সত্যস্বরূপ। সত্য স্বয়ং প্রকাশ। তাকে কোন রক্ত আঁখি রাজদণ্ড নিরোধ করতে পারে না। আমি সেই চিরন্তন স্বয়ম প্রকাশের বীণা, যে বীণায় চিরসত্যের বাণী ধ্বনিত হয়েছিল। আমি ভগবানের হাতের বীণা। বীণা ভাঙলেও ভাঙতে পারে, কিন্তু ভগবানকে ভাঙবে কে? এ কথা ধ্রুব সত্য যে, ভগবান আছেন, চিরকাল ধরে আছেন এবং চিরকাল ধরে থাকবেন। নির্বোধ মানুষের অহঙ্কারের অন্ত নেই, সে যাঁর সৃষ্টি, তাঁকেই সে বন্দী করতে চায়,শাস্তি দিতে চায়। কিন্তু অহঙ্কার একদিন চোখের জলে ডুববেই ডুববে। আমি মর, কিন্তু আমার বিধাতা অমর। আমি মরব, রাজাও মরবে, কেননা আমার মতো অনেক রাজদ্রোহী মরেছে, আবার এমনি অভিযোগ আনয়নকারী অনেক রাজাও মরেছে — কিন্তু কোন কালে কোন কারনেই সত্যের প্রকাশ নিরুদ্ধ হয়নি, তাঁর বাণী মরেনি। আমার হাতের বাঁশী কেড়ে নিলেই বাঁশীর সুরের মৃত্যু হবে না। সুর আমার বাঁশীতে নয়, সুর আমার মনে এবং আমার বাঁশী সৃষ্টির কৌশলে। সুতরাং দোষ আমারও নয়, আমার বীণারও নয়, দোষ তাঁর যিনি আমার কন্ঠে তাঁর বীণা বাজান। তাঁকে শাস্তি দেবার মতো রাজশক্তি বা দ্বিতীয় ভগবান নেই।আমি পরম আত্মবিশ্বাসী। আর যা অন্যায় বলে বুঝেছি, অত্যাচারকে অত্যাচার বলেছি, মিথ্যাকে মিথ্যা বলেছি, কাহাকেও তোষামোদ করিনি, প্রশংসা ও প্রসাদের লোভে কারো পিছনে পোঁ ধরিনি----। আমি ভগবানকে হীন করিনি, লাভ লোভের বশবর্তী হয়ে আত্ম- উপলব্ধিকে বিক্রি করিনি, নিজের সাধনালব্ধ বিপুল আত্মপ্রসাদকে খাটো করিনি, কেননা আমি যে ভগবানের প্রিয়, সত্যের হাতের বীণা, আমি যে কবি, আমার আত্মা যে সত্যদ্রষ্টা ঋষির আত্মা।" আমাদের তথাকথিত কবি সাহিত্যিকদের মুখোশ খুলে যাবে, যদি আধ্যাত্মিক কবি নজরুলকে তুলে ধরা যায়।

