সর্বশ্রেষ্ঠ ভগবৎ-প্রেম
শ্রীমদ্ভাগবতে কোথাও শ্রীরাধা বা অন্য কোন গোপীর নামোল্লেখ নেই। রাসলীলায় দেখা যায় , গোপীরা মহাত্মা শ্রীকৃষ্ণের কাছে আদর ও সম্মান লাভ করে গর্ব অনুভব করলেন এবং প্রত্যেকেই নিজেকে পৃথিবীর সকল রমণীর প্রধান বলে মনে করতে লাগলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তখন গোপীদের সৌভাগ্যজনিত মান ও গর্ব দূর করার জন্য এবং তাদের মঙ্গল বিধানের ইচ্ছায় সেখান থেকে অন্তর্হিত হলেন। ভগবানকে এই ভাবে হারিয়ে গোপীরা তখন একেবারেই দিশেহারা হয়ে ভগবত চিন্তায় সম্পূর্ণ তন্ময় হয়ে গেলেন। গোপীরা তখন সকলে মিলে পাগলের মত উচ্চৈঃস্বরে কৃষ্ণ গুণগান করতে করতে বন থেকে বনান্তরে সেই প্রেমময়ের সন্ধান করতে লাগলেন। এইভাবেই গোপীরা বৃন্দাবনের এক জায়গায় গিয়ে পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণের পদচিহ্ন দেখতে পেলেন। গোপীরা তখন ওই সকল পদচিহ্নের সাহায্যে কৃষ্ণের অন্বেষণ করতে করতে কৃষ্ণের পায়ের ছাপের সাথে আর একজন গোপীর পদচিহ্ন দেখে দুঃখিত হয়ে পরস্পর বলাবলি করতে লাগলেন —অনয়ারাধিতো নূনং ভগবান্ হরিরীশ্বরঃ। যন্নো বিহায় গোবিন্দঃ প্রীতো যামনয়দ্রহঃ।। (এটি ভাগবতের দশম স্কন্ধের ৩০ অধ্যায় ২৮ নম্বর শ্লোক)। এটির অর্থ হলো—"এই গোপী, যাঁর পায়ের চিহ্ন এখানে রয়েছে, তিনি যথার্থই শ্রীভগবানের আরাধনা করেছেন ; সেই জন্যই শ্রীহরি আমাদের সকলকে পরিত্যাগ করে সানন্দে এঁকেই একান্তে নিয়ে এসেছেন।" এ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, এই গোপীই ছিলেন সকলের শ্রেষ্ঠা। এই শ্লোকে রয়েছে অনয়ারাধিতো নূনং—এই গোপী কর্তৃক ভগবান যথার্থই রাধিত, আরাধিত হয়েছেন। "রাধিত" শব্দ থেকেই শ্রীরাধার নাম পাওয়া যাচ্ছে। এই বিশেষ গোপী, যাঁকে শ্রীকৃষ্ণ একান্তে নিয়ে এসেছিলেন, ভাবলেন—আমিই সমস্ত রমণী কুলের শ্রেষ্ঠা; কারণ কৃষ্ণ আর সকলকে ত্যাগ করে একমাত্র আমারই অনুবর্তন করেছেন। শ্রীরাধার ভগবত প্রেম সর্বশ্রেষ্ঠ। সেই জন্য অপর গোপীদের মনে দেহাভিমান এলেও, তিনি কিন্তু ভগবানেই নিবিষ্ট-চিত্ত ছিলেন ; সুতরাং ভগবান থেকে তাঁর বিচ্যুতি হয়নি। ভগবান লোক শিক্ষার জন্য লীলা করতে অবতীর্ণ হয়েছেন। সুতরাং ভগবানের ইচ্ছাতেই কৃষ্ণময়ী শ্রীরাধিকার হৃদয়েও আত্মাভিমান এল। অতএব কৃষ্ণও তখন শ্রীরাধার কাছ থেকে অন্তর্হিত হলেন। কৃষ্ণের অন্তর্ধানের সাথে সাথেই শ্রীরাধা নিজের ভুল বুঝতে পারলেন এবং কাতর হয়ে প্রার্থনা করতে লাগলেন হে নাথ তুমি কোথায়? আমি তোমার দাসী; দয়া করে একবার দেখা দাও।

