আত্মম্ভরিতার লেজ
বিজ্ঞজনদের বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের পর্যবেক্ষণগুলি চিরকালীন যথার্থ হিসাবেই বিবেচিত হবে। কারণ তথাকথিত বিজ্ঞদের চরিত্রের বদল প্রায় হয়না বললেই চলে। রবীন্দ্রনাথ অসাধারণ একটি মূল্যায়ন করে বলেছেন, সর্পজাতি বোধকরি বড়ো বুদ্ধিমান হবে, না হলে তারা বেঁকে চলে কেন? হে বিজ্ঞগণ, তোমরাও খুব বুদ্ধিমান, কিন্তু একটা বিষয়ে তোমাদের জানা নেই—পৃথিবীতে সিধা জিনিসও অনেক আছে। তোমাদের প্রাণের বাঁকা আরশিতে যে একটা বাঁকা ছায়া দেখছো, জগতের চেহারাখানা নিতান্তই এইরকম নয়। হায় হায়! জন্মেজয় যখন সর্বসত্র করেছিলেন তখন কি গোটাকতক ঢোঁড়া সাপই মরেছিল, তোমাদের মত বিষাক্ত বুদ্ধিমান সাপগুলো ছিল কোথায়? তুমি সৎ কাজ করছ বলে বিজ্ঞ লোকেরাও যে তাকে সৎ মনে করবে এ কীকরে আশা করা যায়? তাহলে বিধাতা তাদের বিজ্ঞ করে গড়লেন কেন? অতি বুদ্ধিমান জীবের সম্মুখের দাঁতের পাটিতে যে একটা দারুণ হাস্যবিষ আছে, হে জগদীশ্বর, সেই বিষ থেকে পৃথিবীর যাবতীয় সৎকাজকে রক্ষা করো। এরা যখন পরস্পর টেপাটিপি করে বলতে থাকেন, "এই লোকটার মতলব বুঝেছ? কেবল আমাদের খোশামোদ করা বা অমুকের নিন্দা করা বা সাধারণের কাছে নাম পাবার প্রয়াস।"—তখন সৎ লোকের জীবনের মূলে গিয়ে কুঠারাঘাত পড়ে, তার সমস্ত জীবনের আশা ম্রিয়মাণ হয়ে যায়। তোমরা প্রাণ খুলে হাসতে পারো না, প্রাণ খুলে প্রশংসা করতে পারো না, প্রাণ খুলে পরকে বিশ্বাস করতে পারো না। "যদি" "কিন্তু" "কদাচ" "কিঞ্চিৎ" প্রভৃতি কথাগুলো ব্যবহার করে কৃপণের দড়ি বাঁধা টাকার থলির মুখের মতো তোমাদের ভাষাকে কুঞ্চিত সংকুচিত করে তুলেছো। একেই তোমরা বিজ্ঞতার লক্ষণ মনে করো। ভদ্রতাকে হীনতা মনে করা, যে তোমাদের নিজের মতাবলম্বী নয় তাকে অশিক্ষিত অপদার্থ মনে করা, যশস্বী লোকের যশ কে ফাঁকি মনে করা, তোমাদের চেয়ে শতগুণে বিদ্বান লোকের বিদ্যার গভীরতা নেই বলে লোকের কাছে প্রচার করা, কিঞ্চিৎ হাতে রেখে মত ব্যক্ত করা, নিজেকে ভারী একজন মস্ত লোক বলে মনে করা—এই সকলকে তোমরা বিজ্ঞতার লক্ষণ বলে জানো। তোমাদের আত্মম্ভরিতা নামক লাঙ্গুলের প্রসরটা অত্যন্ত অধিক। তোমাদের শরীরের আয়তন অধিক নয়, কিন্তু লেজ থেকে মাপলে অনেকটা হয়।

