সম্পাদকের পাতা
ডিএ মানে কি দেরি আছে?
প্রকাশিত: ১৯ মে, ২০২৬
সংকল্পপত্রের অন্যতম ঘোষণা মতো পশ্চিমবঙ্গের ডবল ইঞ্জিন সরকার ক্ষমতায় আসার ১০ দিনের মধ্যেই রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য সপ্তম পে কমিশন গঠনের ঘোষণা করে দিল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার বৈঠকে গৃহীত হল নতুন বেতন কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত। তবে যাবতীয় আশায় জল ঢেলে মহার্ঘভাতা বা ডিএ নিয়ে সিদ্ধান্ত ঝুলেই থাকল। এতাই বেতন কমিশনের ঘোষণা সত্ত্বেও কার্যত হতাশ কর্মচারী মহল। যদিও রাজ্যের তরফে জানানো হয়েছে, এদিনের বৈঠকে সিদ্ধান্ত না হলেও, আগামী দিনে বকেয়া ডিএ ইস্যুতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সরকারি কর্মচারীদের অভিযোগ, পূর্ববর্তী সরকারের আমল থেকেই এই মহার্ঘ ভাতা নিয়ে নানা টালবাহানা চলছে। সুপ্রিম কোর্ট বকেয়া মহার্ঘ ভাতা দেওয়ার রায় দিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিক্ষকেরা তা আদৌ পাবেন কি না তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। তৃণমূল সরকারের নানা পদক্ষেপে শিক্ষকদের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়। এর প্রতিবাদে গত ১৩ মার্চ ধর্মঘটে শামিল হন শিক্ষকদের একাংশ। তার পরই বিকাশ ভবন সূত্রে খবর পাওয়া যায়, রাজ্য অর্থ দফতরের তরফে একটি নির্দেশিকায় জানানো হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট দফতর স্থির করবে কোন পদ্ধতিতে বকেয়া মহার্ঘ ভাতা দেওয়া হবে।
তবে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে কর্মীরা জয়ী হলেও, শেষ পর্যন্ত পূর্বতন সরকার তাঁদের প্রাপ্য ডিএ'র ব্যবস্থা করে যেতে পারেনি। ফলে বাংলায় পরিবর্তনে বড়ো ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছিল মহার্ঘভাতা। তাই শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই সরকারি কর্মীরা আশায় বুক বেঁধে রয়েছেন। সোমবারের বৈঠকে ডিএ নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী। তাই সবার নজরও ছিল এদিন নবান্নে। বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে বেরিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে বকেয়া ডিএ ও সপ্তম বেতন কমিশন নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হবে। সপ্তম বেতন কমিশন নিয়ে সিদ্ধান্ত হলেও বকেয়া ডিএ নিয়ে সিদ্ধান্ত তো দূরের কথা কোনও আলোচনাই হয়নি। অবাক হয়েছি। সবাই আশা করেছিলাম আজ হয়তো ডিএ ঘোষণা হবে। সত্যি হতাশ হওয়ার মতোই ঘটনা।
এদিকে নয়াদিল্লি থেকে জারি হওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের জন্য মহার্ঘ ভাতা বাড়ানোর ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের ডিএ ৫৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬০ শতাংশ করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এই বৃদ্ধি রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে কার্যকর হয়েছে এবং এটি কর্মীদের মূল বেতনের উপর প্রযোজ্য হবে। সপ্তম বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী নির্ধারিত ‘পে ম্যাট্রিক্স’-এর ভিত্তিতে এই ডিএ গণনা করা হবে। পাশাপাশি ডিএ-কে বেতনের পৃথক উপাদান হিসেবেই গণ্য করা হবে এবং এটি মূল বেতনের অংশ হিসেবে ধরা হবে না। এই বিজ্ঞপ্তি কার্যকর হলে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কর্মচারীদের ডিএর ফারাক বেড়ে হচ্ছে ৪২ শতাংশ। এক শিক্ষক জানান, রাজ্য সরকারি কর্মীদের মহার্ঘ ভাতা নিয়ে টানাপড়েন চলছে বহুদিন ধরে। ২০১৮-এ বহু আবেদন-নিবেদনের পর সরকারি কর্মচারীদের ১৫ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা ঘোষণা করেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু সে সময় তাঁর ‘মিউ মিউ-ঘেউ ঘেউ’ মন্তব্য নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হয়। বিরোধীরা অসংবেদনশীলতার অভিযোগ তোলেন। এমনকি কলকাতা হাইকোর্টও এই মন্তব্যকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ আখ্যা দেয়। তার পর গঙ্গায় গড়িয়েছে অনেক জল, বয়স বেড়েছে সরকারের। বকেয়া মহার্ঘ ভাতা নিয়ে দ্বন্দ্বও বেড়েছে সরকার ও কর্মীদের মধ্যে। পথে নেমে আন্দোলন করেছেন শিক্ষকদের একাংশ। শেষে সরকারের পতন হয়েছে। কিন্তু মহার্ঘ ভাতা পাওয়া যায়নি। নতুন সরকারের কাছে আবেদন, শিক্ষকদের বঞ্চনার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করুন। সোমবারের বৈঠকের দিকে তাকিয়ে ছিলেন রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা। কিন্তু সেখানেও ডিএ নিয়ে কোন প্রসঙ্গ না ওঠায় তাঁরা হতাশ। ক্যাবিনেট বৈঠকের শেষে সোমবার নারী, শিশু ও সমাজকল্যাণ দপ্তরের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। সেখানে তিনি বলেন, রাজ্যের সরকারি কর্মচারী এবং বিধিবদ্ধ সংস্থা, বোর্ড, নিগম, স্থানীয় সংস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন কাঠামো সংশোধনের লক্ষ্যে সপ্তম রাজ্য বেতন কমিশনের গঠন করা হবে।
বকেয়া ডিএ দেওয়া হবে কি না, এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে অগ্নিমিত্রা বলেন, ডিএ দেওয়া নিয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু আজকের ক্যাবিনেট মিটিংয়ে এই বিষয়টি এজেন্ডায় (কর্মসূচিতে) ছিল না। মাধ্যমিক শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সম্পাদক অনিমেষ হালদার বলেন, আগের মতো এই সরকারও দান খয়রাতি নিয়েই থাকল। শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের প্রাপ্য দেওয়ার বিষয়ে টালবাহানা। আমরা হতাশ। যৌথ মঞ্চের তরফে আহ্বায়ক ভাস্কর ঘোষ বলেন, সপ্তম পে কমিশনের দাবি আমাদের ছিল। আমাদের দাবি ছিল, পে কমিশন চালু করে যেন কার্যকর করা হয়। বছরের পর বছর ফেলে না রাখা হয়। তবে অন্তত ৪ শতাংশ ডিএ দিয়ে, রাজ্য সরকার সদিচ্ছা দেখাত যে তারা দিতে চায়। তবে আমরা সরকারকে সময় দিতে চাই।
অনেককেই দেখা গেল ডিএ শব্দটি নিয়ে মজা করতে। তাঁরা লিখলেন ডিএ মানে কি দেরি আছে?

