বঙ্গোপসাগরে ‘সমুদ্র মন্থনে’ নামছে ভারত, জ্বালানি সুরক্ষায় মোদি সরকারের বড় পদক্ষেপ
নিজস্ব প্রতিনিধি: মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালীতে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল ও এলপিজি গ্যাসের সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিরতার সরাসরি ও গুরুতর প্রভাব পড়েছে ভারতের ওপর। দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে এবার এক অভিনব ও দূরদর্শী পদক্ষেপ নিল নরেন্দ্র মোদি সরকার। ভারতের বর্তমান ‘শিরে সংক্রান্তি’ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের জলসীমায় অনাবিষ্কৃত জ্বালানি তেল ও গ্যাসের ভাণ্ডার অনুসন্ধানে নামছে কেন্দ্র।এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশিতে এক বিশাল ‘সমুদ্র মন্থন’ বা জরিপ অভিযান শুরু করতে চলেছে ভারত সরকার। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে এই সংক্রান্ত একটি আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। এই টেন্ডারের মূল উদ্দেশ্য হলো বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রের তলদেশে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ব্যাপক জরিপ চালানো, যাতে সেখানে লুকিয়ে থাকা বিপুল তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত খুঁজে বের করা যায়।
প্রযুক্তিগতভাবে এই প্রকল্পকে বলা হয়, ‘টুডি ব্রডব্যান্ড মেরিন সিসমিক অ্যান্ড গ্র্যাভিটি-ম্যাগনেটিক ডেটা অ্যাকুইজিশন, প্রসেসিং, অ্যান্ড ইন্টারপ্রিটেশন’। সহজ কথায়, এই প্রকল্পের মাধ্যমে সমুদ্রতলের বিশাল ভূগর্ভস্থ স্ক্যান করা হবে। সমুদ্রতল জরিপের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত জাহাজগুলো সমুদ্রের মধ্য দিয়ে স্ট্রিমার নামক লম্বা, তারের মতো যন্ত্র টেনে নিয়ে যাবে। এই যন্ত্রগুলো সমুদ্রতলের নিচে শক্তিশালী শব্দ তরঙ্গ পাঠাবে এবং পাথর থেকে প্রতিফলিত প্রতিধ্বনি রেকর্ড করবে। এই ডেটা ব্যবহার করে, বিজ্ঞানীরা কয়েক কিলোমিটার নিচের সমুদ্রতলের বিস্তারিত চিত্র তৈরি করবেন। সেখান থেকেই জানা যাবে নিচে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের উৎস রয়েছে কি না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত তার প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৫ শতাংশ এবং এলপিজি গ্যাসের এক বিশাল অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে। হরমুজ প্রণালীর মতো সংবেদনশীল রুট অবরুদ্ধ বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভারতের অর্থনীতিতে তার বড় ধাক্কা লাগে। এই পরিস্থিতিতে বঙ্গোপসাগরের গভীর তলদেশ ভারতের জন্য নতুন আশার আলো হয়ে উঠতে পারে।সরকার নিয়োজিত সংস্থাগুলি অত্যাধুনিক সিসমিক সার্ভে ও উন্নত প্রযুক্তির ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে সমুদ্রপৃষ্ঠের হাজার হাজার ফুট নিচে অনুসন্ধান চালাবে। এই জরিপ সফল হলে ভারত নিজের জলসীমাতেই জ্বালানির এক নতুন ও নির্ভরযোগ্য উৎস পেয়ে যাবে। এর ফলে একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা থেকে দেশ রক্ষা পাবে, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। মোদি সরকারের এই সময়োপযোগী ‘সমুদ্র মন্থন’ ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হতে চলেছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

