এত ভগ্নদশা কেন?
গ্রীক সাহিত্য থেকে আমাদের মহাভারত পর্যন্ত নানা ধরনের বিয়োগান্ত ঘটনায় ভরা। আমাদের চারিদিকেই বিয়োগান্ত পরিস্থিতি দেখতে পাই। গীতায় মানব জীবনের বিয়োগান্ত পরিস্থিতিকে দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৬৭ নম্বর শ্লোকে সুন্দরভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, বিষয়ের প্রতি ধাবমান ইন্দ্রিয়গুলির অনুসরণে যার মন ব্যস্ত, ওই ইন্দ্রিয়গুলি তার বিবেক বুদ্ধি হরণ করে নেয়। ঘূর্ণিঝড় যেমন জলে ভাসমান জাহাজকে বিপথে টেনে নিয়ে যায় তেমনি ইন্দ্রিয়গুলিকে হরণ করে নিয়ে যায় ইন্দ্রিয়ের বিষয়গুলি। ইন্দ্রিয় তন্ত্র যখন ইন্দ্রিয়ের বিষয়ের প্রতি ধাবমান হয় মনও তখন তাদের অনুসরণ করে। মন যখন ঐরূপ কাজ করে, তখন মানব সত্তার চরম পরিণতি হয়। মানুষের যেটুকু প্রজ্ঞা থাকে তাও বিলুপ্ত হয়ে যায়। সব বিয়োগান্ত পরিস্থিতির একটি সাধারণ লক্ষণ হল, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা ও পারিপার্শ্বিক শক্তির দ্বারা অভিভূত হয়ে পড়া। মঞ্চে অভিনীত বিয়োগান্ত নাটক দেখতে আমাদের খুবই ভালো লাগে কিন্তু নিজের জীবনে অভিনীত হলে তা হয় বিপজ্জনক। লোকে বিয়োগান্ত পরিস্থিতি দেখে, আবার নিজের জীবনে তার পুনরাভিনয় করে বসে। সেটি হয় আরো বড় ধরনের বিয়োগান্ত পরিস্থিতি। বাসনার তাড়নায় আমি থুবড়ে পড়ি প্রাপ্তির দিকে, আর প্রাপ্তিতে অবসন্ন হই বাসনার উপভোগে। এই হল মানুষের ভগ্ন দশা। আমাদের সামগ্রিক জীবনকে সাফল্যমণ্ডিত করতে হলে তার জন্য চাই কোন বিজ্ঞানসম্মত দর্শনের নির্দেশনা। আমরা কি চাই আমাদের জীবন জাহাজের ভরাডুবি হোক? অথবা আমরা কি চাই আনন্দে ও শান্তিতে পূর্ণ হয়ে আমাদের জীবনের শিখরে বিচরণ করি? এই প্রশ্ন আমার নিজের কাছে আর এর উত্তর আমায় পেতেই হবে। এভাবেই গীতা প্রত্যেককে উচ্চতর জীবন লাভের সংগ্রামে প্রবর্তিত করেছেন। বলা হয়েছে, নিজের প্রচেষ্টাতেই এ কাজ করতে হবে। অন্য কেউ এই কাজ আমার জন্য করে দেবে না। এই কাজের জন্য অন্যকে বকলমা দেওয়া চলে না। বিবেকচুড়ামণিতে বলা হয়েছে, যদি পিতা ঋণগ্রস্ত হয়, পুত্রাদি বা অন্য কেউ তার হয়ে ঋণ শোধ করতে পারে কিন্তু পিতা যদি দাসত্ব বা বন্ধন দশাগ্রস্ত হয় তাহলে তিনি নিজে ছাড়া অন্য কেউ সে দশা ঘোচাতে পারে না।

