দীক্ষাগুরু ও পরমগুরু
পরা বিদ্যা অর্থাৎ আত্মজ্ঞান লাভের বিদ্যা এবং অপরা বিদ্যা অর্থাৎ জাগতিক যাবতীয় বিদ্যা লাভের জন্য প্রয়োজন হয় গুরুর। এই সকল গুরুগণের গুরু হলেন জ্ঞানীশ্রেষ্ঠ আদিগুরু মহর্ষি বেদব্যাস। আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথিটি পালিত হয় আদিগুরু বেদব্যাস বা ব্যাসদেবের আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে। তাই এই পূর্ণিমা ব্যাসপূর্ণিমা ও গুরুপূর্ণিমা নামেই পরিচিতি। প্রাচীন বৈদিক সভ্যতার উন্নত কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে সুশৃঙ্খলভাবে যাঁরা সমাজকে পরিচালনা করেছিলেন তাঁরা ভারতের আধ্যাত্মিক গুরু বা উপনিষদের ঋষিগণ। আর সেই গুরুগণের গুরুধর্ম রূপায়ণের কারুকৃৎ হলেন আধ্যাত্মিক পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রূপকার, বৈদিক সভ্যতার প্রথম অবতার কবিশ্রেষ্ঠ মহর্ষি বেদব্যাস। শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন,সকলেরই গুরু সেই এক সচ্চিদানন্দ। যেহেতু আমরা তাঁকে সাক্ষাৎভাবে ধরতে পারছি না, এজন্য সাধনের সহায়করূপে কোন মানবগুরুকে আশ্রয় করতে হয় এবং মানবগুরুর প্রতি ঈশ্বরদৃষ্টি রাখতে হয়। শাস্ত্রের নির্দেশ অনুযায়ী মানব- গুরু হলেন সেই ঈশ্বর-গুরুর প্রতীক বা প্রতিমা। মানব- গুরু তাঁর সাধ্যানুসারে শিষ্যকে চরমলক্ষ্যে অর্থাৎ ঈশ্বরানুভূতিতে পৌঁছতে সাহায্য করেন। কিন্তু সচ্চিদানন্দ-গুরু সাধককে তাঁর স্বরূপ প্রাপ্তির পথে এগিয়ে নিয়ে যান এবং তিনিই সাধকের সাধনপথের সর্বদা সঙ্গী, পথনির্দেশক ও চরম লক্ষ্য। শ্রীরামকৃষ্ণের পার্ষদগণ শ্রীরামকৃষ্ণকে একাধারে গুরু এবং ইষ্ট বলতেন। সেই অনুসারে তাঁদের সম্প্রদায়ের গুরুগণ কেউ নিজেকে গুরু মনে করেন না। তাঁরা নিজেদের শ্রীরামকৃষ্ণের সাধনধারার ধারক ও বাহক মাত্র মনে করেন। শ্রীরামকৃষ্ণদেবই গুরু। তবে প্রথমে দীক্ষাগুরুর ভিতর তাঁকে ভাবতে হয় এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে দীক্ষাগুরুকে ইষ্টে লয় করতে হয়। ধ্যানের পক্ষে এটাই সহজ ও স্বাভাবিক প্রণালী। সচ্চিদানন্দই গুরু। তিনি সর্বত্র বিরাজমান। তিনি সকলের অন্তরে সবসময় রয়েছেন। তাঁকে হৃদয়ে ধ্যান করতে হবে। দীক্ষাগুরু হলেন পথ পরমগুরুর কাছে পৌঁছানোর। অজ্ঞানতিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জন- শলাকয়া। চক্ষুরুন্মীলিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।।

